রেগুলার খাদ্যাভাসে ডিম কেন রাখবো? বিস্তারিত আলোচনা

ডিম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

রেগুলার খাদ্যাভাসে ও দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ডিম কে কেন প্রতিদিন রাখা উচিত , এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ও পুষ্টি বিজ্ঞানভিত্তিক অসংখ্য কারণ রয়েছে। ডিম কেবল মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করে না , এটি মানুষের শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেশি গঠন ও রোগের ঝুঁকি কমানো সহ পুরো শরীরে সুরক্ষা এক এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। আজকে আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা জানবো ডিম সম্পর্কে, কিভাবে সংরক্ষণ করা হয় ? কিভাবে খাওয়া যায়? কোন কোন কাজে খাবার ব্যবহার করা যায়।

সূচিপত্র , দৈনন্দিন খাদ্যাভাসে ডিমের গুরুত্ব 

  • ডিমের পুষ্টি উপাদান, এটিকে কেন বলা হয় প্রাকৃতিক পাওয়ার হাউস
  • ডিম সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি ও কৌশল।
  • নিয়ম করে ডিম খেলে যেসব উপকার হয় 
  • সঠিক উপায়ে ডিম খাওয়ার পদ্ধতি
  • গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য ডিমের প্রয়োজনীয়তা 
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার অনুভূতি
  • কত রকম পদ্ধতিতে ডিম খাওয়া যায় 
  • ডিম খাওয়ার পাশাপাশি আরো বহুমুখী ব্যবহার 
  • উপসংহার 

ডিমের পুষ্টি উপাদান, এটিকে কেন বলা হয় প্রাকৃতিক পাওয়ার হাউস

একটি পরিপূর্ণ ও সুষম খাদ্য অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃতি আমাদের যে কয়েকটি সেরা খাবার উপহার দিয়েছে তাদের মধ্যে ডিম একটি অন্যতম খাদ্য। ডিম দামের দিক দিয়ে যেমন সাশ্রয়ী, তেমন রন্ধন প্রণালীতে রয়েছে এর বহুমুখী ব্যবহার এবং পুষ্টিগুণের ঠাসা ,তাই এই ডিমকে বলা হয় সুপারফুড। বর্তমানে বাংলাদেশে সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিম একটি সহজলভ্য খাদ্যে পরিণত হয়েছে । বিশেষ করে স্টুডেন্ট বা ব্যাচেলরদের জন্য ডিম খুবই স্বাস্থ্যকর ও সহজ একটি খাবার। সকালে ঝটপট নাস্তা বানানো থেকে শুরু করে রাতের ভারী খাবার সবখানেই ডিমের অবাধ বিচরণ । ডিম কেবল মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করে না, এ ছাড়াও  আমাদের শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে এবং মস্তিষ্কের দ্রুত কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে পেশি গঠনের গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখে।

একটি আস্ত ডিমের ভিতর যেসব পুষ্টি উপাদান রয়েছে , তাকে এক কথায় জীবন ধারণের ফুয়েল বা জ্বালানি বলা চলে। সাধারণ একটি নতুন প্রাণ তৈরি করার জন্য যে ধরনের সমস্ত উপাদান প্রয়োজন তা কিন্তু একটি ডিমের ভিতরে প্রাকৃতিকগতভাবে সংরক্ষিত থাকে।

একটি মাঝারি আকারের (প্রায় ৫০ গ্রাম ) সিদ্ধ ডিমের সাধারণত যে উপাদান গুলো থাকে তা নিচে ছক আকারে প্রকাশ করা হলো।

ডিম সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি ও কৌশল

ডিমকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে, এটি দীর্ঘদিন ভালো থাকে না। ডিমের পুষ্টিগুণ পুরোপুরি বজায় রাখতে হলে এবং "ব্যাকটেরিয়ার" আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হলে ডিম এর সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে গরমের সময় ডিম দ্রুত সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। ডিম যেন দীর্ঘ সময়  সতেজ রেখে সংরক্ষণ করা যায়, সে পদ্ধতি গুলো নিচে দেওয়া হলো। 

সাধারণ তাপমাত্রায় ডিম সংরক্ষণ পদ্ধতিঃ আগের যুগে যখন ফ্রিজ ছিল না, তখন সাধারণত আমাদের মা চাচীরা যেভাবে ডিম সংরক্ষণ করত সেই পদ্ধতিটি হল, ডিমটিকে এমন একটি স্থানে রাখতে হবে। যেখানে সরাসরি সূর্যের আলো বা আগুনের উত্তাপ থাকবে না এবং ঘরের জায়গাটি হবে ঠান্ডা, শুষ্ক এবং অন্ধকারচ্ছন্ন এরকম জায়গায় রাখতে হবে। এই পদ্ধতিতে ডিম রাখলে সাধারণত একটি ডিম ৭-১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে।

রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ পদ্ধতিঃ ফ্রিজে ডিম রাখার ক্ষেত্রে এর আদর্শ তাপমাত্রা হলো ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম। ফ্রিজে ডিম রাখার জন্য ফ্রিজের সামনে দরজার জার্কে ডিম রাখা উচিত নয় । সাধারণত ফ্রিজে খোলা অবস্থায় ডিম রাখাই উচিত না। ফ্রিজে ডিম রাখতে হলে কোন একটা কৌটাতে বা পলিথিনের ভিতর রেখে এর মুখটা বন্ধ করে দিয়ে ফ্রিজের ভিতরে রাখা ভালো । বন্ধ অবস্থায় ডিম থাকলে , ডিমের যে "ব্যাকটেরিয়া" থাকে সে "ব্যাকটেরিয়া" গুলো অন্যান্য খাবারে ছড়াতে পারে না।

ডিম রাখার সঠিক দিকঃ ফ্রিজের ডিম রাখার সঠিক পদ্ধতিটা হলো ডিমের দুইটা দিক থাকে। একটা হচ্ছে চ্যাপ্টা, একটা হচ্ছে সূচালো অংশ, সংরক্ষণের সময় সূচালো বা চোখা অংশটি নিচের দিকে এবং চ্যাপ্টা অংশটি উপরে দিকে রাখা উচিত। ডিমের চ্যাপ্টা অংশে একটি এয়ার পকেট থাকে ,এই অংশ উপরের দিকে রাখলে ভেতরের কুসুম মাঝখানে থাকে এবং এয়ারপকেট এর কারণে কুসুমটি খোসার সংস্পর্শে এসে সহজে নষ্ট হয় না।

ধুয়ে ডিম সংরক্ষণ না করাঃ আমাদের মাঝে একটা ভুল ধারণা আছে ,ডিম ধুয়ে ফ্রিজে খোলা অবস্থায় রাখলে অন্যান্য খাবারে ডিম থেকে জীবাণু ছড়াতে পারেনা। তাই বাজার থেকে  ডিম কিনে বাসায় নিয়ে আসার পর পরই কাপড় ধোয়ার পাউডার দিয়ে ডিম ভালোভাবে ওয়াশ করে ফ্রিজে রাখে , এটা কখনোই করা উচিত না। ডিমের খোসার উপর প্রাকৃতিক ভাবে কিউটিকল বা লোম নামে একটি পাতলা প্রতিরক্ষামূলক আবরণ থাকে যা বাইরের ধুলাবালি বা ব্যাকটেরিয়াকে ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। পানি বা সাবান দিয়ে দিম ধুয়ে দিলে এই উপরের এই  আবরণটি নষ্ট হয়ে যায় এবং খোসার শুষ্ক ছিদ্র দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ভিতরে প্রবেশ করতে পারে ।এই জন্য ডিম রান্নার ঠিক আগ মুহূর্তে ভালো করে ধুয়ে তারপর ডিম রান্না করা উচিত।

ডিম ভালো আছেন নাকি নষ্ট পরীক্ষা করা সহজ উপায়ঃ অনেক সময় দেখা যায় ডিম সিদ্ধ করার পরে ডিমটি নষ্ট থাকে, এজন্য ডিম সিদ্ধ করার আগে বা রান্নার আগে বুঝার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। পদ্ধতি হল ডিম একটি পাত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিয়ে এই পাত্রের মধ্যে ডিমটি ছেড়ে দিন , যদি ডিমটি নিচে ডুবে যায়, তাহলে বুঝবেন  ডিমটি একেবারে সতেজ আছে এবং খাওয়ার উপযুক্ত।  আর যদি দেখেন ডিম পানির পাতিলে তলায় দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু ভেসে উঠে না তাহলে বুঝবেন ডিমটা কিছুটা পুরাতন কিন্তু নষ্ট না খাওয়ার উপযোগী আছে , খাওয়া যাবে। আর ডিম যদি পুরোপুরি একবারে পানির উপরে ভেসে ওঠে , তাহল এই ডিমটি নষ্ট হয়ে গেছে বা খাওয়ার অনুপযোগী।

নিয়ম করে ডিম খেলে যেসব উপকার হয় 

একজন মানুষ প্রতিদিন যদি নিয়ম করে ১-২টি ডিম রেগুলার খায় , তাহলে তার শরীরের উচ্চমানের প্রোটিন , ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণ হয় এবং তার সার্বিক স্বাস্থ্য খুবই ভালো থাকে।

উচ্চমানের প্রোটিন ও পেশী গঠনের ভূমিকাঃ  মানুষের শরীরে কোষ তৈরি, মেরামত ও হরমোন এনজাইম মিশ্রনের জন্য প্রোটিন অত্যন্ত জরুরী কিন্তু সব প্রোটিনের গুণগত মান কিন্তু সমান হয় না। ডিমে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন ,তাই  পুষ্টিবিজ্ঞানে ডিমকে বলা হয় প্রোটিনের মানদন্ড। মানব দেহের জন্য যে প্রয়োজনীয় ৯ টি অপরিহার্য অ্যামিনো এসিড প্রয়োজন হয়, তা ডিমের মধ্যে সঠিক অনুপাতে রয়েছে।  আমাদের শরীরের এই অ্যামিনো এসিড গুলো নিজে নিজে তৈরি করতে পারে না । যা খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং ডিমের মাঝে এই প্রোটিনটি কমপ্লিট অবস্থায় রয়েছে।

যে প্রোটিন মানবদেহ সহজে শোষণ ও ব্যবহার করতে পারে, সেই প্রোটিনের সম্পূর্ণ অংশ ডিমের মাঝে রয়েছে। মানবদেহের প্রোটিনের কার্যকারিতা মাপার জন্য জৈবিকমানের ভ্যালু দেখা যায় , ডিমের জৈবিকমানের ভ্যালু ১০০ , যা মাংস , দুধ ও সয়াবিনের চেয়ে অনেক গুন বেশি। এর কারণে ডিমের প্রোটিন মানবদেহে দ্রুত শোষণ করে। অ্যাথলেটিক্স এবং জিমকারীরা কিন্তু অন্যান্য খাবারের চেয়ে ডিমটা বেশি খেয়ে থাকে। এর কারণ হচ্ছে ডিম মানব দেহের পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে  মানবদেহে পেশির পরিমাণ কমতে থাকে এবং দুর্বলতা বৃদ্ধি পায়। এর জন্য বয়স্করা নিয়ম করে ডিম খেলে বয়স্কদের দুর্বলতা অনেকটা কমে যায় এবং পেশি শক্তিও বৃদ্ধি পায়।

মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে ডিম কোলিনঃ কোলিন এমন একটি জিনিস যা আমাদের মত সাধারন মানুষ এই বিষয়টি সম্পর্কে জানেও না বা চিনেনা। অথচ এই কোলিন মানবের মস্তিষ্কে বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক খাবারেই  কোলিনের অভাব রয়েছে , তবে একটি বড় ডিমে প্রায় ১৪৭ মিলিগ্রাম কোলিন থাকে , যা একটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খাদ্যের ২৫ থেকে ২৭% পূরণ করে থাকে এই দুর্লভ উপাদানটি ।নিয়মিত কোলিন  সমৃদ্ধ খাবার খেলে  স্মৃতিভ্রংশ  বা ভুলে যাওয়া  রোগ প্রতিরোধ সাহায্য করে থাকে । কোলিন মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র কে শান্ত রাখতে এবং স্টেজ বা বিষন্নতা  দূর করতে বেশ ভূমিকা রাখে ।

হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ভালো কোলেস্টেরলঃ আমাদের দেশের মানুষের মাঝে একটি ভুল ধারণা রয়েছে , যে ডিম খেলে মানুষের কোলেস্টেরল বাড়ে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানে  এই ধারণাকে ভুল হিসাবে প্রমাণ করেছে। ডিমে থাকা কোলেস্টেরল হচ্ছে মানুষের শরীরে ভালো কোলেস্টেরল তৈরি করতে সাহায্য করে যা শরীরে এইচডিএল বেশি থাকে এবং হৃদরোগ ও স্টোকের ঝুঁকি অনেক কম করে থাকে। 

যদিও ডিমে এলডিএল কোলেস্টরেল থাকে,  তবে তা অনেক ছোট ঘন কণা থেকে বড় লার্জ-এলডিএলএ রূপান্তরিত হয় লার্জ-এলডিএল ধমনীতে জমাট বাঁধে না ফলে এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় না। 

বর্তমান আধুনিকায়নের অনেক কিছুই খাবারের মধ্যে প্রস্তুত থাকে।  এর মধ্যে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ ডিম। বর্তমানে বাজারে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ ডিম পাওয়া যায়।  যার ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল কমাতে দারুন কাজ করে। 

ওজন নিয়ন্ত্রণঃ ওজন নিয়ন্ত্রণ  ডিমের ব্যাস ভূমিকা রয়েছে। যারা সুস্থ উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান তারা অবশ্যই অবশ্যই ডিম খাদ্য তালিকাতে রাখবেন। কেননা অন্যান্য খাবারের তুলনায় ডিম খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা থাকে, প্রোটিন হজম করতে শরীরে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় । একটি উচ্চ প্রোটিন আমাদের মেট্রোপলিজম বা হজম প্রক্রিয়া দ্রুত করে যা ফ্যাট বার্ন করতে সাহায্য করে।  সকালের নাস্তায় শর্করা বা রুটি পরোটার বদলে যদি ডিম খেলে সারা দিনে আর প্রায় ৩০০-৪০০ ক্যালরি কম গ্রহণ করা হয়। একটি মাঝারি ডিমে  মাত্র ৭০-৮০ ক্যালোরি থাকে, অথচ এটি শরীরের বড় পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

হাড় ও দাঁতের সুরক্ষা ভিটামিন ডিঃ  সূর্যের আলোয় যে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, এই ভিটামিন ডি প্রাকৃতভাবে সাধারণত অল্প কিছু খাবারই পাওয়া যায় ,কিন্তু  ডিমের কুসুমের মধ্য  সেই ভিটামিন ডি পাওয়া যায় , যা আমাদের শরীরের হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে। আমরা যে খাবারই খাই না কেন যদি এই ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার বা না খাই তাহলে শরীরের ক্যালসিয়াম সঠিকভাবে শোষিত হতে পারে না । ভিটামিন ডি হাড়কে খাবার থেকে ক্যালসিয়াম চুষে নিতে সাহায্য করে। এছাড়া নিয়মিত ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেলে হাড় দুর্বল বা ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় । হাড়ের পাশাপাশি দাঁত ও মাড়ি মজবুত রাখতে  ভিটামিন ডি ও ফসফরাস এর ভূমিকা অপরিহার্য।

ত্বক , চুল ও নখের সৌন্দর্য বৃদ্ধিঃ  মানবদহের বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য দামি দামি প্রসাধনী ব্যবহার করা হয় কিন্তু এসব দামী দামী প্রসাধনীর ব্যবহারের চেয়ে ভালো ভিতর থেকে শরীরকে পুষ্টি দেওয়া। এর জন্য পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার ।ডিম মানবদেহকে ভিতর থেকে সুন্দর করে তোলে,তাই ডিমকে বলা হয় বিউটিফুল ফুড। 

কেরাটিন উৎপাদনঃ বায়োটিন শরীরের কেরাটির নামক প্রোটিনের কার্যক্ষমতা ও উৎপাদন বাড়িয়ে ত্বক, চুল ও নখকে শক্ত করে তোলে। কেরাটিন চুলের গোড়া বা হেয়ার ফলিকল মজবুত করে এবং চুল পড়া  কমায়। নখের আদ্রতা বজায় রাখে এবং দুর্বল নখ শক্ত ও  দীর্ঘ করে তোলে ।

সংক্রমণ রোধঃ ডিম খেলে এন্টি ইনফ্লামাইটরি ও এন্টিব্যাকটোরিয়াল হিসাবে কাজ করে এবং ত্বকের উপরে ভাগের মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করে এবং ত্বককে করে তোলে মসৃণ।

চোখের স্বাস্থ্যঃ ডিমের কুসুমে দুই ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে , বর্তমান যুগে আমরা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ও মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। ফলে চোখের উপর অনেক চাপ পড়ে । এছাড়াও বয়সের ভারে চোখের ছানি পড়ে। এই বয়সের সাথে সাথে চোখের দৃষ্টিশক্তির কমে যাওয়ার প্রধান কারণ অ্যাজ রিলেটেড মেকুলার ডিজেনারেশন । প্রতিদিন ডিমের কুসুম খেলে এতে থাকা ভিটামিন এ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই ঝুকি হ্রাস করে। এছাড়াও রাতকানা রোগ প্রতিরোধেও ডিমের ভিটামিন এ অধিক কার্যকর।

সঠিক উপায়ে ডিম খাওয়ার পদ্ধতি

ডিমে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি, তবে যত্রতত্রভাবে ডিম খেলেই  ডিমের সম্পন্ন পুষ্টি পাওয়া যায় না। ডিম খাওয়ার জন্য একটি এই সঠিক উপায় বা পদ্ধতি রয়েছে। সঠিক উপায়ে বা পদ্ধতিতে ডিম খেলে ডিম থেকে অবশ্যই ১০০% পুষ্টি পাওয়া যায়। ডিম থেকে সম্পূর্ণ পুষ্টি পেতে হলে ডিমকে অবশ্যই ভালো করে সিদ্ধ করে খাওয়াই সেরা উপায়। তবে ডিম ভেজেও খাওয়া যায় । তবে সম্ভব হলে কম তেলে ভেজে খাওয়ার চেষ্টা করবেন , অতিরিক্ত তেল বা ডালটা এড়িয়ে চলায় ভালো। 

আরেকটা কথা , সেটা হচ্ছে কাঁচা ডিমের সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া থাকার ঝুঁকি থাকে। তাই কাঁচা ডিম এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন। কখনোই কাঁচা ডিম খাওয়া উচিত না।

গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য ডিমের প্রয়োজনীয়তা

জীবন চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সময় হলো গর্ভাবস্থায় এবং শৈশবকাল। এই দুই সময়ে ডিমের পুষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

গর্ভাবস্থায় একটি নারীকে অবশ্যই নিয়ম করে ডিম খেতে হবে । কেননা গর্ভবতী নারীদের জন্য ডিমের কোলিন ও ফলিক এসিড খুবই জরুরী। ডিমের কোলিন ও ফলিক এসিড গর্ভ অবস্থায় শিশুর ব্রণের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায় । শিশু নিউরাল টিউব ডিফেক্ট বা মস্তিষ্কের জন্মগত ত্রুটি রোধ করে। 

বাড়ন্ত শিশুদের দৈনিক প্রোটিন ঝিংক ও আয়রনের চাহিদা মেটাতে ডিমের ঝুড়ি নেই , শিশুদের মেধা বিকাশ ও হাড়ের গঠনে প্রতিদিন একটি করে ডিম সিদ্ধ খাওয়া উচিত। শিশুর জন্মের ছয় মাস পর থেকে রেগুলার  সিদ্ধ ডিমের কুসুম খিচুড়ি বা ফর্মুলা মিল্কের সাথে মিশিয়ে নরম করে খাওয়াতে পারেন। তারপর শিশুর এক বছর বয়স থেকে ডিমের কুসুমসহ পুরো আস্ত ডিম খেতে দিতে পারেন। শিশু নিয়ম করে প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলে বাচ্চার দ্রুত ব্রেনের বিকাশ ঘটে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার অনুভূতি

যারা ডায়েট কন্ট্রোল বা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদেরকে নানা রকম নিয়মকানুন মেনে খাবার খেতে হয়, তাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী সস্তা এবং পুষ্টিকর সুপার ফুড হচ্ছে ডিম। ডিম উচ্চমানের প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি খাবার ,সচরাচর প্রোটিন হজম হতে শর্করা বা ফ্যাট এর চেয়ে অতিরিক্ত বেশি সময় নেয়, যা ক্ষুধা কমায়। ফলে সকালে নাস্তা ডিম খেলে দীর্ঘক্ষন পেট ভরা থাকে এবং বারবার বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।

শরীরের ওজন কমানোর জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অত্যাবশক । প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার হজম, শোষণ এবং পুষ্টি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শরীরের অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়। ডিমের প্রোটিন শরীরের হজমপ্রক্রিয়া বা ক্যালরি পোড়ানোর গতি বাড়িয়ে দেয়, যা দ্রুত ওজন কমাতে সাহায্য করে। 

ওজন কমাতে চাইলে সব সময় চেষ্টা করবেন সেদ্ধ ডিম খাওয়ার জন্য । এছাড়াও অল্প তেল বা অলিভ অয়েল দিয়ে অমলেট করে খেতে পারেন। অতিরিক্ত তেল দিয়ে ডিম ভেজে না খাওয়াই ভালো ।অতিরিক্ত তেলে ক্যালোরির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যায়। অনেক সময় প্রশ্ন থাকে যে ডায়েট চলাকালীন সময়ে ডিমের কুসুম খাওয়া যাবে কিনা? হ্যাঁ অবশ্যই একজন সুস্থ মানুষ ডায়েট চলাকালীন সময়ে ১-২ টি ডিম সম্পূর্ণ কুসুমসহ খেতে পারবে। এছাড়া যারা কঠোর ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বা রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকে ,তারা অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কুসুম খাওয়ার চেষ্টা করবেন ,তবে ডিমের সাদা অংশ খাওয়া নিরাপদ।

কত রকম পদ্ধতিতে ডিম খাওয়া যায় 

ডিম এমন একটি খাবার যা খুব সহজে নানা রকম নানা পদ্ধতিতে খাওয়া যায়। শুরুতেই খুব সহজ পদ্ধতিতে  ডিম পোচ করে খাওয়া যায়। পিয়াজ ,মরিচ দিয়ে ডিম ভেজে খাওয়া যায়। ডিম সিদ্ধ করে পিয়াজ দিয়ে ভুনা ভুনা করে খাওয়া যায়। ডিম দিয়ে সালাদ তৈরি করে খাওয়া যায়। এছাড়াও ডিম দিয়ে নানা রকম তরকারি রান্না করে খাওয়া যায়। যেমন আলু দিয়ে ডিম ভেঙ্গে রান্না করে যায়। লাউ দিয়ে ডিম খাওয়া যায়। বিভিন্ন সবজি দিয়ে ভাজি করা যায় । এছাড়াও ডিম দিয়ে ডিম বিরিয়ানি করে খাওয়া যায়,(ডিম বিরিয়ানি বা ডিম পোলাও বলে) এবং নুডুলস ডিম দিয়ে খাওয়া হয়। 

ব্যাকারি আইটেমঃ যত ধরনের ব্যাকারি আইটেম আছে প্রায় সমস্ত কিছুই ডিম দিয়ে তৈরি করা হয়। যেমন কেক, বিস্কিট, কুকিস ,পেস্টি, বান, পেটি ,ম্যারিঙ্গো ,ক্রিম পাফ ও পেস্টি পাই ইত্যাদি।

ডিম খাওয়ার পাশাপাশি আরো বহুমুখী ব্যবহার 

ডিম শুধু রান্না করে খাওয়াই যায়না , এছাড়া ডিমের খোসা, কুসুম  এবং সাদা অংশ অসাধারণ বিভিন্ন রকম কাজে লাগে লাগে।

ডিমের সাদা অংশ রূপচর্চার কাজে ব্যবহার করা হয় । যেমন চুলে ব্যবহার করে, মুখে ব্যবহার করা হয় । এছাড়াও ডিমের খোসা বাগানের ও গাছের যত্নে ব্যবহার করা হয়ে থাকে । ডিমের খোসায় থাকে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম।  খোসা ভালো করে শুকিয়ে গাছের মাটিতে মিশিয়ে দিলে গাছে বৃদ্ধি ভালো হয়। বিশেষ করে টমেটো গাছ ও মরিচ গাছের জন্য এটি বেশ উপকারী । এছাড়াও ডিম সিদ্ধ করা পানি ঠান্ডা করে সেই পানি ফেলে না দিয়ে বিভিন্ন গাছের গোড়ায় টবে ব্যবহার করতে পারেন। 

ডিমের খোসা পোকামাকড় তাড়াতে বেশ ভূমিকা রাখে । গাছের গোড়ায় ডিমের খোসা গুড়ো করে ছড়িয়ে রাখলে এতে শামুক , পিঁপড়া অন্যান্য ক্ষতিকারক পোকা গাছে কাছে ঘেষতে পারে না । এছাড়াও ঘরের ভিতর ডিমের খোসা রাখলে টিকটিকির  আনাগোনা কম থাকে । এছাড়াও আরো একটু মজাদার ডিমের খোসা ব্যবহারের সিস্টেম হল , আমরা অনেক সময় গাছের বীজ লাগানোর জন্য বিভিন্ন প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করি , এই প্লাস্টিকের আমাদের প্রাকৃতির জন্য ক্ষতকর । এর জন্য আপনি প্লাস্টিকের  বদলে ডিমের খোসার অর্ধেক অংশ কৌটা হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন । তাতে মাটি দিয়ে বীজ লাগাতে পারেন ,পরবর্তীতে চারা গজালে  ডিমের খোসাসহ  মাটিতে পুঁতে দিতে পারেন।

উপসংহার

ডিম হলো প্রকৃতির তৈরি এক অনন্য উপহার , যা একই সাথে সুস্বাদু ,সাশ্রয়ী এবং পুষ্টির দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ । পেশি তৈরি , মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানো, চোখে সুরক্ষা, হাড় শক্ত কিংবা ওজন নিয়ন্ত্রণ প্রতিটি স্বাস্থ্যগত লক্ষ্য অর্জনের ডিমের ভূমিকা অনন্য। সাধারণত সব বয়সের মানুষের জন্য প্রতিদিন খাদ্যাভাসে একটি ডিম রাখা প্রয়োজন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

bosontobouryনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Tania Akter
Tania Akter
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অর্ডিনারি আইটির শিক্ষার্থী। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ২ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।