বাংলাদেশের শুঁটকি মাছের বাজার চাহিদা ,পুষ্টিগুণ ও রান্নার প্রসেসিং

বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই শুঁটকি মাছ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। মাছ একটি পচনশীল প্রাণী, প্রাচীনকালে মাছ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার বা ফ্রিজের ব্যবস্থা ছিল না, তখন জেলেরা প্রচুর পরিমাণে মাছ ধরত এবং সেই মাছ কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় সেজন্য তারা প্রাকৃতিক উপায়ে সূর্যের আলো ব্যবহার করে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি করে তৈরি করতো। সে থেকেই বাঙালির খাদ্য তালিকায় শুঁটকি কেবল একটি খাদ্য নয় বরং এটি ক্রিস্টি এবং ঐতিহ্যও বটে।


বাংলাদেশের-শুঁটকি-মাছের-ইতিবৃত্ত.webp


আজকে আমরা এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে জানবো বাংলাদেশে শুঁটকি মাছের বর্তমান বাজার চাহিদা, এর অসাধারণ পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যঝুকি এড়ানোর উপায় এবং ঘরে বসে পারফেক্ট স্বাদের শুঁটকি রান্না আর প্রসেসিং প্রক্রিয়া।


সূচিপত্রঃ শুঁটকির ইতিবৃত্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা 

বাংলাদেশের শুঁটকি মাছের অভ্যন্তরীণ বাজার ও চাহিদা 

আমরা বিভিন্ন বই-পুস্তকে পড়েছি মাছে ভাতে বাঙালি, কিন্ত যখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছি তখন থেকেই মাছে ভাতে বাঙালি বলতে শুধু তাজা মাছের ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য না বরং এর একটি বড় অংশ রয়েছে শুঁটকি মাছ। বাংলাদেশ প্রায় ৮০% মানুষ শুঁটকি  খেতে পছন্দ করে। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সবার কাছে শুঁটকির একটা বিশেষ চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামের অঞ্চলে দেখা যায় সপ্তাহে দুইদিন যে হাট বসে সে হাটের বাজারের তালিকার মাঝে অন্য মাছ-মাংসের সাথে শুঁটকির ও লিস্ট থাকে।বিশেষ করে শীতকালে শুঁটকি  কেনাবেচার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল শুঁটকি উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। কক্সবাজার জেলার নাজিরাটেক বর্তমানে সামুদ্রিক শুঁটকি উৎপাদনের বৃহত্তম কেন্দ্র, যেখানে ৮০% শুঁটকি উৎপাদিত হয়।সেখানে উৎপাদিত  শুঁটকি কেনাবেচার ক্ষেত্রে অনেক রকম মূল্যের তারতম্য দেখা যায়। লইট্টা ,ছুরি, চিংড়ি এবং কাচকি মাছের শুঁটকি সাধারণত মাঝারি দামের হয়ে থাকে ( ৩০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি), তবে রূপচাঁদা ,লাক্ষা মাছের শুঁটকির দাম অনেক বেশি হয়ে থাকে, যা প্রতি কেজি ২০০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয় ।

এছাড়া মিঠা পানির মাছের শুঁটকিও বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের চলনবিলের শুঁটকির প্রচুর পরিমাণ চাহিদা রয়েছে। মিঠা পানির শুঁটকি যেমন চ্যাপা ও সিদল শুটকি ৮০০ থেকে ১৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শুঁটকি মাছের চাহিদা।

শুঁটকি উচ্চস্বাদের হওয়ায় এর চাহিদা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে, ফলে বাংলাদেশ থেকে শুঁটকি রপ্তানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। এ খাতটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অর্থনীতির একটি চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠছে। 

রপ্তানির দেশসমূহঃ বাংলাদেশের শুঁটকির চাহিদা মধ্যপ্রাচ্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, হংকং  এবং ভারতে বিপুল পরিমাণে রয়েছে ।প্রবাসী বাঙ্গালিদের কাছে শুটকির চাহিদা আকাশ্চুম্বী, তাই বাংলাদেশি শুঁটকি এসব দেশের রপ্তানি করা হয়। 

অর্থনৈতিক অবদানঃ প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি বিদেশে রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে । সরকার যদি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্গানিক শুঁটকি  নিশ্চিত করতে পারে তাহলে এই খাত থেকে বার্ষিক ৪০০ কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব হবে।

সামুদ্রিক শুঁটকির প্রধান উৎপাদন অঞ্চল সমূহ 

বাংলাদেশের উৎপাদিত সামুদ্রিক শুঁটকির প্রায় বেশিরভাগই আসে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী জেলা হওয়ায় এবং সমুদ্র থেকে প্রচুর পরিমাণ মাছ ধরে নিয়ে আসা হয় তাই এখানে প্রচুর শুঁটকি উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সামুদ্রিক শুঁটকি  উৎপাদিত হয় কক্সবাজারের নাজিরাটেক। এছাড়া মহেশখালী , সোনাদিয়া ,কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে  প্রচুর পরিমাণে শুঁটকি তৈরি করা হয়

সেখানকার উৎপাদিত শুঁটকি কেনাবেচার প্রধান বৃহত্তর  আড়ত  হচ্ছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের চরচাক্তাই এলাকায় সরাসরি উপকূল থেকে শুঁটকি এনে এই বাজারে পাইকারি বিক্রি করা হয়। এজন্য কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের প্রধান সামদ্রিক শুঁটকির হাব বলা হয়।

এছাড়াও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল যেমন সুন্দরবনের দুবলারচর, খুলনা ও বাগেরহাট এই উপকূলীয় এলাকা থেকেও বিপুল পরিমাণ তাজা মাছ শুকিয়ে বাণিজ্যিকভাবে শুঁটকি তৈরি করা হয় ।

মিঠা পানির শুঁটকির প্রধান উৎপাদন অঞ্চল সমূহ 

বাংলাদেশের মিঠা পানির শুঁটকি প্রধানত দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন হাওর ,খাল, বিল, নদী-নালা থেকে সংগ্রহ করা মাছ থেকে শুঁটকি উৎপাদন করা হয় । সামুদ্রিক শুঁটকির তুলনায় মিঠা পানির শুঁটকির স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়।

  1. উত্তরবঙ্গের শুঁটকিঃ চলনবিলের শুঁটকি বাংলাদেশের প্রধান মিঠা পানির শুঁটকি উৎপাদন হাব। নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের  তাড়াশ এবং পাবনা্র সুজানগর ও চাটমোহর এলাকয় শত শত শুঁটকির চাতাল রয়েছে। এইসব চাতালে বাণিজ্যিকভাবে শুঁটকি তৈরি করা হয়ে থেকে।
  2. হাওড়া অঞ্চলের শুটকিঃ  সিলেট , সুনামগঞ্জ , ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলা হাওর বিস্তৃত হওয়ায় এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে শুঁটকি তৈরি করা হয়। সিলেট ও সুনামগঞ্জ এই অঞ্চলের  চ্যাপা বা সিদল শুঁটকি বিখ্যাত , বিশেষ করে সিলেটের বিশ্বনাথপুর উপজেলার মাহাতাবপুর গ্রামকে শুঁটকির গ্রাম বলা হয় ।এছাড়া সুনামগঞ্জের ইব্রাহিমপুরেও প্রচুর পরিমাণে শুঁটকি তৈরি করা হয়। 
  3. ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায় প্রচুর পরিমাণে  পুঁটি মাছ পাওয়া যায়।সেই পুঁটি মাছ সংগ্রহ করে সেখান থেকে বড় বড় পুঁটি মাছ আলাদা করে চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করা হয়। চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে । 

প্রক্রিয়াটি হল  পুঁটি মাছের আঁশ ছাড়িয়ে পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বাহির করে ভালো করে ধুয়ে কড়া রোধে ৫/৭ দিনের মতো শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর একটি বড় মাটির হাড়ি ব্যবহার করা হয়। মাটির হাড়ির গায়ে যেন কোন ছিদ্র না থাকে সেজন্য পুঁটি মাছের তেল মাটির হাঁড়ির গায়ে ভালোভাবে মেখে রোদে শুকিয়ে  এ হাঁড়িকে সম্পূর্ণ বায়ুরোধী করে নিতে হয়। মাটির হাঁড়িতে পুঁটি মাছ ঢুকানোর আগে মাছগুলোকে পানি ছিটিয়ে সারারাত বাঁশের ঝুড়িতে ঢেকে রাখতে হয়। এর ফলে শুঁটকি  গুলো একটু নরম  ও আর্দ্র হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলে গাজন প্রক্রিয়া। তারপর নরম হওয়া শুঁটকি গুলো মাটির হাঁড়ির ভিতর স্তরে স্তরে খুব শক্তভাবে সাজানো হয়। সাজানো শুঁটকি গুলোকে পা দিয়ে বা শক্ত কিছু দিয়ে জোরে জোরে চেপে চেপে ভেতরে ঢুকানো হয় ।যেন ভিতরে বাতাস বা একটু খালি জায়গা না থাকে, এজন্য এই শুঁটকিকে চ্যাপা শুঁটকি বলা হয় । মাটির হাঁড়িটিকে মুখ পর্যন্ত সম্পূর্ণ শুঁটকি মাছ দিয়ে ভর্তি করতে হয় ,তারপর হাঁড়ির উপরের অংশটি মাছের তেল, ছালা এবং কাদামাটি দিয়ে লেপের দিতে হয়। যাতে একটুও বাতাস না ঢুকতে পারে। সিলগালা করা হাড়িগুলো  মাটির নিচে বা অন্ধকার স্যতসেতে ঘরে ৩/৬ মাস পর্যন্ত রেখে দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ সময় বাতাসহীন অবস্থায় থাকায় প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার কারণে মাছের আংশিক গাজন ঘটে, এতে মাছের হাড় নরম হয়ে যায় এবং সেই চ্যাপার সেই চেনা তীব্র আকর্ষণীয় গন্ধ তৈরি হয় ।

এছাড়া সাতক্ষীরা অঞ্চলেও মিঠা পানির দেশীয় ছোট ছোট মাছের শুঁটকি উৎপাদন করা শুরু হয়েছে । কাপ্তাই লেকের বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ যেমন কাচকি, চাপিলা মাছ শুকিয়ে এখন উন্নতমানের শুঁটকি তৈরি করা হয়।

শুঁটকি মাছের পুষ্টিগুণ ও খাদ্য শক্তি

অনেকে মনে করেন শুঁটকি মাছে কোন পুষ্টি থাকে না, এটা শুধু মুখের স্বাদের জন্য খায়, কিন্তু এটি ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে তাজা মাছের চেয়ে শুঁটকি মাছের পুষ্টির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, কারণ হলো মাছ শুকানোর ফলে মাছের শরীরের পানি চলে গেলও প্রোটিন ও খনিজ উপাদান গুলো সংকুচিত অবস্থায় থেকে যায়।  

নিচে প্রতি ১০০ গ্রাম শুটকি মাছে সাধারণত যে পরিমাণ পুষ্টি উপাদান থাকে তার একটি আদর্শ ছক দেওয়া হলো:

পুষ্টি উপাদানের নাম পরিমাণ (প্রতি ১০০ গ্রামে) শরীরের জন্য শুটকির ভূমিকা
খাদ্যশক্তি ৩০০-৩৫০ কিলোক্যালরি শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি ও বল যোগায়।
প্রোটিন ৬০-৮০ গ্রাম পেশি গঠন,ক্ষয়পূরণ এবং কোষ তৈরীতে সাহায্য করে।
ফ্যাট/চর্বি ৪-৮ গ্রাম হরমোন নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরে শক্তি জমা রাখতে সাহায্য করে।
ক্যালসিয়াম ৭০০-৩০০০ মিলিগ্রাম হাড় ও দাঁত মজবুত করে।
ফসফরাস ৭০০-৮০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের সাথে মিলে হাড়ের ঘনত্ব ঠিক রাখে।
আয়রন ৫-২০ মিলিগ্রাম রক্তস্বল্পতা দূর করে এবং শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করে।
সোডিয়াম ১৫০০-২০০০ মিলিগ্রাম শরীরে তরলের ভারসাম্য ধরে রাখে।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পর্যাপ্ত পরিমাণ হার্ড ভালো রাখে এবং মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।
ভিটামিন ডি উচ্চ মাত্রায় হাড়ের ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে।

জরুরী তথ্য 
বিভিন্ন মাছের প্রকারভেদে শুঁটকিতে প্রোটিনের মাত্রা কম বেশি হতে পারে। যেমন লইট্টা ও ছুরি  শুঁটকিতে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে ,এছাড়া ও অন্যান্য শুঁটকি যেমন কাচকি, মলা বা পুঁটি মাছের মত ছোট ছোট শুঁটকি গুলো কাটাসহ খাওয়া হয় এ কারণে এইসব শুঁটকিতে ক্যালসিয়াম ও আয়রনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।

খাদ্য তালিকায় শুঁটকি রাখার স্বাস্থ্য উপকারিতা

নিয়ম করে পরিমিত পর্যায়ে শুঁটকি খেলে শরীরের পেশী গঠন, হাড় শক্ত করা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে । কেননা শুঁটকির পুষ্টি একটি ঘনীভূত উৎস। মাছের তুলনায়  শুঁটকিতে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে।
শুঁটকিতে থাকা উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস  হাড়ের ক্ষয় রোদ প্রতিরোধ করে, দাঁত এর  গঠন মজবুত করে। বাড়ন্ত শিশু (শিশুরা সচরাচর শুঁটকি খেতে চায় না) ও গর্ভবতী নারীদের ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করে।
  1. শুঁটকিতে থাকা ক্যালরির পরিমাণ কম কিন্তু প্রোটিন বেশি থাকায় এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে , যারা ওজন কমাতে চান বা ডায়াবেটিসের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য এটি চর্বিহীন প্রোটিনের উৎস।
  2. যাদের রক্তস্বল্পতা সমস্যা আছে তারা নিয়ম করে শুঁটকি খেতে পারেন , কারণ শুঁটকিতে থাকা আয়রন শরীরের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে।
  3. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে শুঁটকি সাহায্য করে । শুঁটকিতে থাকা জিংক এবং সেলোমনিয়া  ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে ।
  4. সামুদ্রিক শুঁটকিতে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে তাই যাদের উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা আছে এবং কিডনির রোগীরা শুঁটকি খাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।

ক্যামিকেল ও কীটনাশক-যুক্ত শুঁটকি চেনার উপায় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। 

ঐতিহ্যগতভাবে শুঁটকি শুকানোর নিয়ম খোলা আকাশের নিচে রেখে রোদে শুকানো। শুঁটকি শুকানোর সময় দেখা যায় অনেক মাছি ও পোকা আক্রমণ করে  থাকে । মাছি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ঠেকাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন রকম ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকে। এসব কেমিক্যাল শুঁটকিকে তরতাজা রাখে ঠিকই, কিন্তু এই কেমিক্যাল যুক্ত শুঁটকি খেলে মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।যা লিভার, কিডনি বা ক্যান্সারের মতো রোগের কারণও হতে পারে।

  • মাছি বা পোকা না বসাঃ শুঁটকি কিনতে গিয়ে যদি দেখেন শুঁটকির চাতালে বা দোকানে শুঁটকির উপর কোন রকম মাছি বা পোকামাকড় বসছেনা, তাহলে ধরে নিবেন এটা কীটনাশক ব্যবহার করা শুঁটকি ।অতএব এই শুঁটকি কেনার  আগে দশবার ভাববেন।
  • অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও তীব্র গন্ধঃ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে শুকানো শুঁটকি এতটাও চকচক বা পরিষ্কার দেখা যাবে না। কিন্তু কেমিক্যাল  যুক্ত শুঁটকি অতিরিক্ত মাত্রায় পরিষ্কার ও চকচকে হয় এবং এর থেকে তীব্র ঝাঁঝালো রাসায়নিকের গন্ধ আসে। 
  • সহজে ভেঙে না যাওয়াঃ কীটনাশক দেওয়ার শুঁটকি সহজে ভেঙ্গে যায় না ,এটি সাধারণত অনেক দিন শক্ত থাকে এবং এবং সহজে নষ্ট হয় না ,পোকা ও ধরে না।
সমাধানঃ বর্তমান সময়ের সরকারি ও বেসরকারি এর উদ্যোগে গ্রীন হাউস ড্রয়ার বা মৎস্য নেট ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে শুঁটকি প্রসেসিং ও উৎপাদিত হচ্ছে। সব সময় চেষ্টা করবেন শুঁটকি কেনার সময় উপরের বিষয়গুলো খেয়াল রাখার।

শুঁটকি রান্নার পূর্ববর্তী প্রসেসিং, গন্ধ ও বালু দূর করার সঠিক নিয়ম

শুঁটকি রান্নার স্বাদ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেকটাই নির্ভর করবে রান্নার উপর। শুঁটকির সঠিক রান্নার প্রাথমিক প্রস্তুতি, প্রসেসিং এবং ধুলোবালি ও অতিরিক্ত গন্ধ দূর করার নিয়ম নিচে দেওয়া হল। 

কাটা ও বাছাঃ বিভিন্ন রকম শুঁটকি বিভিন্ন রকম ভাবে কেটে নিতে হয়। যেমন বড় লইট্টা, ছুরি ফাঁইসা ও  অন্যান্য শুঁটকিগুলো ছোট ছোট টুকরা করে কেটে নিতে হবে। ছোট ছোট মলা,চিংড়ি,টেংরা ইত্যাদি শুঁটকিগুলো না কাটলেও হবে।
হালকা ভাজাঃ শুকনা শুঁটকি গুলো সব সময় চেষ্টা করবেন আগে শুকনো কড়াইতে ২/৩ মিনিট হালকা ভাবে টেলে বা ভেজে নিতে। এভাবে শুঁটকি টেলে নিলে শুঁটকির কাঁচা ও  আঁশটে গন্ধ অনেকটা দূর হয়ে যায়, তখন  শুঁটকির মাঝে একটা ভাজা ভাজা ফ্লেভার আসে এতে খেতে ভালো লাগে।
গরম ও ঠান্ডা পানির ব্যবহারঃ টেলে নেওয়া সামুদ্রিক শুঁটকি গুলো গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিবেন, গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিলে শুঁটকিটা নরম হয় এবং সাগরের বালি ও কেমিক্যাল থাকলে চলে যায়। মিঠা পানি শুটকি গুলোতে চেষ্টা করবেন হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে সাথে সাথে তুলে ফেলতে। নয়তোবা মাছের গায়ের মাংসগুলো গরম পানির সাথে চলে যাবে। 
চ্যাপা ও সিদল শুঁটকি ধোয়ার নিয়মঃ  চ্যাপা ও সিদল শুঁটকিতে কখনোই গরম পানি ব্যবহার করবেন না। সব সময় চেষ্টা করবেন ঠান্ডা পানি দিয়ে হালকাভাবে ধুইতে , কেননা এই শুঁটকি গুলো খুবই নরম হয়, এই শুঁটকিতে গরম পানি দিলে সাথে সাথে শুঁটকির গায়ের সমস্ত মাছগুলো চলে যাবে শুধু কাটাই অবশিষ্ট থাকবে তখন আর রান্না করতে পারবেন না।(ব্যক্তিগত  অভিজ্ঞতা থেকে বলছি)
আরো পড়ুনঃ

বাঙালির কয়েকটি জনপ্রিয় শুঁটকির রেসিপি ও রান্নার পদ্ধতি 

সঠিকভাবে প্রসেসিং করে রান্না করলে শুটকি খুবই মজাদার একটি খাবার হয়। এখানে কয়েকটি শুঁটকির রেসিপি সংক্ষিপ্ত আকারে দেওয়া হল।

সামুদ্রিক শুটকির ভুনা 

উপকরণঃ সামুদ্রিক যে কোন শুঁটকি যেমন লইট্টা ,ছুরি ইত্যাদি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিবেন। একটু বেশি পরিমাণ পিঁয়াজ এবং রসুন ,কাঁচা মরিচ, হলুদ মরিচের গুড়ো, লবণ ও তেল ।
প্রস্তুত প্রণালীঃ কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি, কিছুটা রসুন আস্ত রাখবেন ,কিছুটা থেতলে দিবেন ,তারপর হালকা ভাজতে থাকবেন । ভাজা হয়ে গেলে এতে পরিমাণ মতো হলুদের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া ,লবণ দিয়ে অল্প পানি দিয়ে সুন্দর করে মসলাটা কষিয়ে নিবেন। কষানো মসলাতে শুঁটকিগুলো দিয়ে দিয়ে আরেকটু ভালো করে কষিয়ে নেবেন তারপর অল্প পরিমানে পানি দিয়ে অল্প আঁচে আস্তে  রান্না করবেন, রান্নার পরে উপরে তেল ভেসে আসলে কাঁচা মরিচ দিয়ে নামিয়ে নিবেন , আপনি ইচ্ছে করলে একটু লেবু পাতা এড করতে পারেন ।(সেম প্রসেসে বেগুন দিয়ে রান্না করতে পারেন)

চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা 

চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা একেক জায়গায় একেক রকম করে বানায় ,তবে আমি এখানে ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর দুইটা রেসিপি এড করলাম।
ময়মনসিংহঃ চ্যাপা শুঁটকি, কাঁচা মরিচ, রসুন পরিষ্কার করা রসুনের কোয়া, পেঁয়াজ কেটে বড় বড় টুকরা করে নিবেন। (সামান্য পরিমাণ আদা কুচি)কড়াইতে সামান্য পরিমাণ তেল দিয়ে পিঁয়াজ কাঁচামরিচ রসুন সিদ্ধ হওয়ার মতো করে ভেজে নেবেন, উপকরণ গুলো ভাজা হয়ে গেলে এগুলো তুলে একটা বাটিতে রেখে ওই তেলেই চ্যাপা শুঁটকি ভালো করে ধুয়ে ভেজে নিবেন। তারপর সবগুলো উপকরণ পাটায়   আধা বাটা করে নিবেন,শেষে অল্প পরিমানে আদা কুচি এড করে নিবেন ।
নরসিংদীঃ নরসিংদীর চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা বানানো সহজ এবং খুবই মজাদার। প্রথমে পাটাতে শুকনা মরিচ ভালো করে ধুয়ে ফিনিশিং করে বেটে নিবেন তারপর চ্যাপা শুঁটকি ভালো করে ধুয়ে লাউ পাতা বা কচু পাতার ভিতরে মুড়িয়ে তাওয়াতে এপিঠ  ওপিঠ উল্টাপাল্টা ভালো করে টেলে নিবেন। টেলে নেওয়ার পর  পাতাটি ভালো করে পরিষ্কার করে পুরা অংশটি ফেলে পাতাসহ শুঁটকিটা বেটে নিবেন, তারপর কাঁচা পেঁয়াজ থেঁতলে নিয়ে লবণ দিয়ে মাখিয়ে নিবেন ।ব্যাস হয়ে গেল চাপা শুটকি  ভর্তা ।(সেম প্রসেসে সিদল শুঁটকির ভর্তা করা হয়)

বাংলাদেশের-শুঁটকি-মাছের-ইতিবৃত্ত


নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী চ্যাপা শুঁটকির বড়া

এত এত শুঁটকির  রেসিপির ভিড়ে একটা শুঁটকি রেসিপি না বললেই নয় ,তা হলো নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী চ্যাপা শুঁটকির বড়া। এই বড়া যে একবার খেয়েছে সে দ্বিতীয়বার অবশ্যই  খেতে চাইবে।
উপকরণঃ লাউ অথবা মিষ্টি কুমড়া পাতা, নয়তো বা কচু পাতা। শুকনা মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, একটা আলু সিদ্ধ ও শুঁটকি।

বাংলাদেশের-শুঁটকি-মাছের-ইতিবৃত্ত.webp


প্রস্তুত প্রণালীঃ শুকনা মরিচ ও শুঁটকি ভালো করে বেটে নিয়ে একসাথে পিয়াজ ও রসুন আধাবাটা করে ভর্তা বানিয়ে  নিতে হবে। আলু সিদ্ধটা সাথে মিক্সড করে নিয়ে সবগুলো বাটা উপকরণ একসাথে লবণ দিয়ে মিশিয়ে নিয়ে কড়াইতে অল্প পরিমাণে তেল দিয়ে দুই মিনিটের মত রান্না করে পানিটা শুকিয়ে নিতে হবে। উপকরণগুলো ঠান্ডা হয়ে গেলে একটা একটা করে পাতার ভিতরে অল্প পরিমানে ভর্তা দিয়ে ভাজ দিয়ে নিতে হবে । তারপর সবগুলো বড়া কড়াইতে তেল দিয়ে মচমচা করে ভেজে নিতে হবে। ব্যাস হয়ে গেল নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী চ্যাপা শুঁটকির বড়া।

বিভিন্ন সবজি দিয়ে চ্যাপা/সিদল শুঁটকি রান্না  

বাঙালি জাতি শুঁটকিকে বিভিন্ন রকম উপায়ে রান্না করে খায়। এর মধ্যে আরেকটা হচ্ছে অনেক রকম সবজি দিয়ে শুঁটকি রান্না । শুঁটকি শুধু ভুনা বা ভর্তা করে খাওয়া যায় না ,সব ধরনের সবজি দিয়েও মজাদার করে রান্না করে খাওয়া যায়। নিচের রেসিপি দেওয়া হল।
উপকরণঃ বিভিন্ন রকমের সবজি যেমন আলু ,পটল, ঝিঙ্গা, ধুন্দুল, বেগুন, সজিনা ডাটা , বরবটি ইত্যাদি (আপনি চাইলে এর সাথে লাউ শাক, মিষ্টি কুমড়া শাক ও আরো মিশানো শাক দিয়েও রান্না করতে পারেন) পিয়াজ, রসুন ,কাঁচা মরিচ ও শুঁটকি।
প্রস্তুত প্রণালী, শুরুতে পাতিলের তেল দিবেন ,তেল গরম হয়ে গেলে সমস্ত সবজিগুলো দিয়ে, হলুদের গুড়া, মরিচের গুঁড়া ও লবণ দিয়ে সবজিগুলো ৮০% সিদ্ধ করে নেবেন। তারপর শিল্ পাঠাতে পিঁয়াজ ,কাঁচামরিচ, রসুন ও শুঁটকি আধা বাটা করে নিয়ে সবজি উপরে দিয়ে ভালো করে নাড়াচাড়া করে ঢেকে দিয়ে বাকি ১০০% সিদ্ধ করে নামিয়ে নিবেন, হয়ে গেল মজাদার সবজি দিয়ে শুঁটকি রান্না। 

কচুর লতি দিয়ে শুঁটকি রান্না 

প্রথমে কড়াইতে তেল দিবেন, তেল গরম হলে পেঁয়াজ বাটা, রসুন বাটা, মরিচের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়া, লবণ ও শুঁটকি দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিবেন। কষানো হয়ে গেলে কচুর লতিগুলো দিয়ে আবারো কষিয়ে নিবেন, তারপর পানি দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করে নিবেন, কচুর লতির এই রান্নাটা খুবই সুস্বাদু হয়।

পয়েন্ট টু বি নোট, শুঁটকি দিয়ে আলু ভাজি করা যায় ,কাঁঠাল বিচি দিয়ে ভুনা করা যায় ,কাঁকরোল দিয়ে ভাজি করা যায়, এরকম প্রচুর রেসিপি আছে যা শুঁটকি দিয়ে রান্না করা যায়।

উপসংহার 

বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টরে শুঁটকি একটি দারুণ সম্ভাবনাময় ও লাভজনক আয়ের অংশ,এটি গ্রামীণ অর্থনীতির উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের কর্মসংস্থানের এক বিশাল অবদান রাখছে। তবে এই শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদেরকে শতভাগ বিষমুক্ত নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন করতে হবে। কেননা বাংলাদেশের শুঁটকি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে, এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী শুঁটকিকে মেড ইন বাংলাদেশ একটি ব্র্যান্ড তৈরি করা করতে হলে আমাদের উচিত আধুনিক ড্রয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এবং ভোক্তা হিসেবে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে যাতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা শুঁটকি বেছে নিতে পারি  ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

bosontobouryনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Tania Akter
Tania Akter
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অর্ডিনারি আইটির শিক্ষার্থী। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ২ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।