গরমে পানি শূন্যতায় ভুগছেন ? জেনে নিন সুস্থ থাকার উপায়

আপনার শরীরে পানি শূন্যতা হচ্ছে কিনা তা বুঝতে না পারলে বড় ধরনের বিপদ বা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুকিয়ে বেড়ে যায় । তীব্র গরমে জনজীবন যখন উষ্ঠাগত, তখন শরীরের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায় পানি শূন্যতা  বা ডিহাইড্রেশন । ডিহাইড্রেশন শরীরে দুর্বল করে ফেলে এবং বড় ধরনের মারাত্মক হিটস্ট্রোকের রূপ নিতে পারে।



 আমাদের শরীরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই পানি কিন্তু অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে শরীর  সোডিয়াম পটাশিয়াম বের হয়ে যায় ।সঠিক সময় যদি আমরা সঠিক  ব্যাবস্থা না নিতে পারি তাহলে এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। আজকে আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা জানবো কিভাবে  শরীরকে সতেজ রাখা যায় এবং পানি শূন্যতা রোধে কি কি পদক্ষেপ নিলে পানি শূন্যতা রোধ করা যায়। 


সূচিপত্রঃ গরমে  পানি শুন্যতা রোধে করনীয়

পানি শূন্যতা কি এবং কেন হয় 

পানি শূন্যতা হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যখন শরীরের যতটুকু পানি প্রয়োজন হয় সে পরিমাণ পানি ফিরে না আসা  বা সেই পরিমাণ পানি না খেলে পানির যে ঘাটতি তৈরি হয় তাকে পানি শূন্যতা বলে।

গরমে আমাদের শরীরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ত্বক  দিয়ে যে ঘাম নির্গত হয় বা ঘামের সাথে যে পানি বা প্রয়োজনীয় খনিজ বেরিয়ে যায় , কিন্ত সেই ভাবে পর্যাপ্ত পানি না করা হলে ডিহাইড্রেশন বা পানি শূন্যতা হয়।অতিরিক্ত পানিশুন্যতার ফলে রক্ত চলাচলের সমস্যা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঠিক কার্যক্রমতা হারায় ।

ডিহাইড্রেশন এর প্রাথমিক ও জটিল লক্ষণ সমূহ  

শরীর যখন পানির অভাব বোধ করে তখন শরীর কিছু সংকেত দিয়ে থাকে এগুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত না  ।কেননা ছোট ছোট সমস্যা থেকে বড় বড় রোগের সূত্রপাত হয় । তাই শুরুতেই এগুলো লক্ষ্য রেখে চলতে হবে। 

ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ শুরুতে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয় । প্রবল তৃষ্ণা , মুখ ঠোট শুকিয়ে যাওয়া , মাথা ঘোরা এবং এবং প্রস্রাবের রং গারো হলুদ হওয়া ।এই অবস্থায় গুরুত্ব না দিলে এটি তখন আরো জটিল অবস্থায় পৌঁছায় ।তখন গিয়ে দেখা দেয়  শরীরের প্রচুর ক্লান্তি, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়। শ্বাস-প্রসার দ্রুত চলাচল করে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং অনেক সময় প্রস্রাব হয় না। অনেক সময় হিটস্ট্রোকে মানুষ মারা যায় ।তাই গরমে বেশি করে পানি পান ও তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। 

পানিশুন্যতা রোধে প্রতিদিন কতটুকু পানি পান করবেন। 

সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ সবল মানুষকে দিনে ৩ লিটার (৭-১০) গ্লাস পানি পান করা উচিত । তবে তীব্র গরমে এই পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত ঘামে , কঠোর পরিশ্রম করে্‌ রোদে মাঠের কাজ করে তাদের প্রতি ঘন্টা অন্তর অন্তর ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম পানি পান করা প্রয়োজন।

আরোন পড়ুনঃ শিশুর হাম হলে করণীয় বাঁ প্রতিকার 

সব সময় পিপাসা লাগলে পানি খেতে হবে এমন কোন কথা নয় , অতিরিক্ত ঘামলে প্রস্রাব বা হালকা হলুদ থাকলে তখনই পানির খেতে হবে আর সব সময় অতি একবারের পানি খাওয়া যাবে না বারবার অল্প অল্প করে পানি পান করা বেশি কার্যকর। 

ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালেন্ঃ শুধু কি পানি যথেষ্ট ?

ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্সের জন্য শুধু পানি যথেষ্ট না। কেননা পানির সাথে সাথে শরীর অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে লবনও বেরিয়ে যায়। তাই শুধু সাদা পানি আপনার শরীরকে সতেজ করতে পারে না। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে ওরস্যালাইন খেতে হবে । এছাড়া আপনি চিনির বদলে সামান্য লবন লেবু মিশিয়ে পানি খেতে পারেন এটি শরীরের জন্য চমৎকার কাজ করে  ।এটি শরীরের সোডিয়াম পটাশিয়ামের ভারসাম্য  বজায় রাখে।

পানি শূন্যতা রোধে ফল ও সবজির ভূমিকা 

পানি শূন্যতা রোধে শুধুমাত্র সাদা পানি শরীরের বিহাইড্রেশন দূর করে না । বিভিন্ন রকমের খাবারের মাধ্যমেও শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করা যায় ,বিশেষ করে ফল ও সবজি।

  1. গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে , শক্তি যোগায় এবং ভিটামিন ,  মিনারেল সরবরাহ করে ও হজম ভালো রাখার জন্য নিয়মিত ফল ও সবজি খাওয়া উচিত। 
  2. তরমুজঃ  তরমুজে রয়েছে প্রায়  ৯০% পানি যা শরীরের পানির শূন্যতা দূর করতে সহায়ক। 
  3. ডাবঃ ডাব হচ্ছে প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইট উৎস। কচি ডাবের পানিতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে যার শরীরের কার্যক্রমতা দ্রুত বৃদ্ধি করে ।
  4.  শসাঃ শসা শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং পানির সরবরাহ করতে শসার জুড়ি নেই, কারণ শসার মধ্যে প্রচুর পানি রয়েছে ।
  5. আনারস ও মাল্টাঃআনারস ও মাল্টাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি এবং পানির দারুণ সংমিশ্রণ । যাদের প্রস্রাবে ইনফেকশন ও প্রসাব গাঢ় হলুদ হয়ে যাওয়ার সমস্যা আছে তাদের জন্য মালটা ও আনারস খুবই উপকারী  ফল। 
  6. বাঙ্গি ও মিষ্টি আলুঃ বাঙ্গি ও মিষ্টি আলুতে রয়েছে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার ও পানি ।যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়ক
  7. লেবুঃ এই গরমে লেবুর কোন তুলনাই হয় না। প্রতিদিন লেবু পানি  খেলে শরীরের ডি হাইড্রেশন প্রতিরোধ করে, শরীরের ক্ষতিকারক উপাদান এনটিরেডিক্যাল দূর করে ফলে রোগের ঝুঁকি কমে যায়।
  8. এই গরমে সবজির পাতলা ঝোল খুবই উপকার করে ।বিশেষ করে লাউ ,শসা , ঝিঙ্গা ,পেঁপে । এইসব সবজি গুলো  দিয়ে ছোট মাছের পাতলা ঝোল করে খেতে পারেন,টমেটো ,আম  দিয়ে টক করে মসুর ডাল রান্না করে খেতে পারেন।

পানিসূন্যতা রোধে গরমের আদর্শ ডায়েট ,কি খাওয়া উচিৎ,অনুচিৎ 

গরমের তীব্রতায় শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং পানিশূন্যতা রোধ করতে একটি আদর্শ ডায়েটার নিচে দেওয়া হল।

সকাল 

সকালে চিরার সাথে ঠান্ডা দুধ কলা বা আম মিশিয়ে খেতে পারেন ।

পাতলা আটার রুটির সাথে লাউ তরকারি বা পেঁপের সবজি ।

টক দই  খেতে পারেন,টক দই হজমে খুব ভালো সাহায্য করে 

দুপুরের আগে 

দুপুরের আগে আপনি তরমুজ ,শসা বা আনারস খেতে পারেন ।

 এক গ্লাস ডাবের পানি বা চিনি ছাড়া লেবু শরবত পারেন।

দুপুরের খাবার 

এক কাপ সাদা ভাত 

লেবু দিয়ে পাতলা মসুর ডাল বা মুগ ডাল 

কম মসলায় রান্না করা ছোট মাছ বা পাতলা মুরগির ঝোল 

লাউ, ঝিঙ্গা ,চিচিঙ্গা ,পটলের মত পানিও সবজি এক বাটি খেতে পারেন। 

প্রচুর পরিমাণে শসা ও টমেটোর সালাত খেতে পারেন। 

বিকালের নাস্তা 

 মাঠা , ঘোল বা লাচ্ছি চিনি ছাড়া খেতে হবে।

গ্রীষ্মকালে বাজারে প্রচুর দেশি ফল পাওয়া যায় তাই যেকোনো একটি মৌসুমী ফল রাখতে পারেন

রাতের খাবার 

দুপুরের থেকে অনেকটা কম খাবার খাবেন । সবজি দিয়ে পাতলা রুটি বা সামান্য পরিমাণ ভাত খেতে পারে 

হজমের সমস্যা এড়াতে রাতে ঘুমানোর কমপক্ষে দুই থেকে তিন ঘন্টা আগে খাবার খেয়ে নে নিতে পারে। 

পয়েন্ট টু বি নোট। 

বেশি তেল মসলাযুক্ত খাবার খাবেন না , হালকা ও পাতলা ঝোলের খাবার খাবেন সবসময় । ডিহাইড্রেশন  থেকে বাঁচার জন্য সব সময় কফি ও চা খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন , কেননা চা ও কফি শরীরকে দ্রুত পানি শূন্য করে ফেলে । অতিরিক্ত চিনিযুক্ত সোডা বা কোল্ড্রিংস এড়িয়ে চলুন এটি শরীরের জন্য একদমই ভালো না। রাস্তার অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার এই সময় খাবেন না।

বাইরে বের হওয়ার সময় বিশেষ সর্তকতা 

অতিরিক্ত রোদে বাইরে প্রয়োজন ছাড়া বের হবেন না । যদি বের হতেই হয় তাহলে নিচের বিষয়গুলো সব সময় খেয়াল রাখবেন। 

সাথে সব সময় একটি পানির বোতল রাখবেন , কিছুক্ষণ পরে পরে পানি খাওয়ার চেষ্টা করবেন । সুতি হালকা রঙ্গের ঢিলাঢালা পোশাক  বিশেষ করে কালো পোশাক ও ভারী রঙের পোশাক এড়িয়ে চলবেন। সরাসরি রোদ থেকে বাঁচতে হলে ছায়াযুক্ত স্থান দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করুন । এছাড়া ছাতা হেট ও সানগ্লাস ব্যবহার করতে পারেন। 

শিশু ও বয়স্কদের জন্য বাড়তি যত্ন। 

শিশু ও বয়স্করা গরমে সবচেয়ে বেশি পানি শূন্যতায় ভোগে । বিশেষ করে শিশুরা অনেক সময় তৃষ্ণার কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না , তাই বড়দের উচিত তাদের বারবার পানি বা ফলের রস খাওয়ানো । বাচ্চা স্কুল থেকে আসলে তাকে প্রতিদিন লেবুর রস বা ডাবের পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন ।  

আর বয়স্কদের ক্ষেত্রে সব সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পানি পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন কেননা বয়স্কদের প্রায়ই কিডনি বা হার্টের সমস্যা থাকতে পারে , বিশেষ করে কিডনি রোগীদের জন্য পানির মাপ থাকে সেই পরিমাণ অনুযায়ী তাদেরকে পানি খাওয়ায় খেতে হয় । 

ঘরোয়া উপায়ে এনার্জি ড্রিঙ্কস। 

বাজারে এনার্জি ড্রিংস না খেয়ে সব সময় চেষ্টা করবেন ঘরে তৈরি করে স্বাস্থ্যকর পানি পান করার জন্য, 

নিচে কয়েকটি স্বাস্থ্যকর পানিয় এর নিয়ম দেওয়া হলঃ 

  1. আখের গুড়ঃযাদের গরমে পশ্রাবে জ্বালাপোড়া আছে তারা আখের গুড়ের সাথে লেবু দিয়ে শরবত খেতে পারেন। এছাড়া ডিহাইড্রেশন  থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন একগ্লাস আখের গুড়ের শরবত খেতে পারেন আখের গুড়ের সাথে লেবু মিশিয়ে শরবত শরীরের জন্য খুবই উপকারী ।
  2. কাঁচা আমঃ কাঁচা আমের শরবত এটি হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে  জাদুর  মত কাজ করে। 
  3. টক দইয়ের ঘোল বা লাচ্ছিঃ প্রবায়োটিক সমৃদ্ধ এই পানীয় হজম শক্তি বাড়ে ,এবং শরীর ঠান্ডা করে সপ্তাহে অন্তত ২ দিন টক দইয়ের ঘোল বা লাচ্ছি বানিয়ে খেতে পারেন ।
  4. বেলের শরবতঃ বেলের শরবত শরীরের পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করে শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। 

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন 

যখন দেখবেন  পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করার পরেও প্রচন্ড মাথা ব্যথা থাকে , বমি বমি ভাব হয় , শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি ফরেনহাইটের উপরে চলে যায় এবং মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয় তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ হতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় নিয়ে বসে থাকলে পরবর্তীতে এটি হিটস্ট্রোক হতে পারে। 

উপসংহারঃগরমে পানি শূন্যতায় ভুগছেন জেনে নিন সুস্থ থাকার উপায়

গরমে সময় দিতে সব সময় শরীরকে পানি শূন্যতা ও লবণশূন্যতা থেকে বাঁচাতে হলে সচেতনতাই হলো এর প্রধান হাতিয়ার  । আপনি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন , সুষমা ফল গ্রীষ্মকালে প্রচুর পরিমাণ ফল পাওয়া যায় , এই মৌসুমী ফলগুলো খেতে পারেন আর সব সময় রোদ এড়িয়ে চলবেন ,বারবার পানি পান করবেন, এই সহজ নিয়ম মেনে চললে অবশ্যই সুস্থ থাকবেন।


আমি একজন পেশাদার কন্টেন্ট রাইটার এবং ব্লগার। । আমার এই ব্লগের মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠকদের কাছে সঠিক, যাচাইকৃত এবং সহজবোধ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া।আমার লেখা যদি আপনাদের কাছে ভালো লেগে থাকে ,তাহলে কমেন্ট করে অনুপ্রেরণা দিবেন আশা রাখছি। বিশেষ করে যারা ঘরে বসে কাজ করতে চান বা ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার শিখতে চান, তাদের জন্য আমি নিয়মিত গবেষণামূলক আর্টিকেল লিখে থাকি। আমার লেখা আপনার উপকারে আসলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।"

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

bosontobouryনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Tania Akter
Tania Akter
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অর্ডিনারি আইটির শিক্ষার্থী। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ২ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।