জমি ভাগ করতে চান? জানুন বন্টননামা সম্পর্কে

জমি সংক্রান্ত বিষয়ে মানুষের আগ্রহ সব সময় বেশি থাকে, জমি জমা বা পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে আমাদের সমাজে বিবাদ  নতুন কিছু নয়। অনেক সময় দেখা যায়, ভাই বোন বা অংশীদার মধ্যে মৌখিকভাবে জমি ভাগাভাগি হয়েছে, কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে গেল আইনি কোন দলিল করা হয়নি। ফলে পরবর্তীতে সে জমি বিক্রি করতে গেলে বা ব্যাংক লোন নিতে গেলে দেখা দেয় বড় ধরনের বিপত্তি। এমনকি শরিকদের মধ্যে কেউ একজন বেঁকে বসলে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক শত্রুতা ।,

আইনি জটিলতা ও পারিবারিক বিবাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হল বন্টননামা দলিল । কিন্তু বন্টননামা আসলে কী? এটি করার সঠিক নিয়ম-ই বা কি? আর কত টাকা বা খরচ হতে পারে আজকের আর্টিকেলে আমরা জমি জমা বন্টননামা প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সুন্দর ভাবে আলোচনা করব, যাতে আপনি আপনার সম্পত্তি নিয়ে  নিশ্চিত থাকতে পারেন।

সূচিপত্রঃ  জমিজমার বন্টন নামা সম্পর্কে জানুন

বন্টননামা দলিল আসলে কি

বন্টননামা দলিল হচ্ছে আপনার পৈত্রিক বা যৌথ মালিকানার সম্পত্তি যখন শরিকদের মধ্যে আপোষ বা মীমাংসার মাধ্যমে যার যার প্রাপ্য অংশ আইনি প্রক্রিয়ায় দলিলের মাধ্যমে ভাগ করে দেওয়া হয় তাকে বন্টননামা দলিল বলে।

 সহজ ভাবে বলতে বুঝায় বন্টন নামা দলিল মানে জমি ভাগ করে নেওয়ার লিখিত প্রমাণ। 

বন্টননামা দলিল না করার ঝুঁকি 

আপনি যদি আপনার জমি বন্টননামা দলিল না করেন তাহলে ভবিষ্যতে আপনি এই জমি নিয়ে বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারেন। যেমন ধরেন আপনি আপনার জমি বিক্রি করতে চাচ্ছে না কিন্তু আপনার কাছেবন্টননামা দলিল নেই, তাহলে আপনি এই জমির জন্য কোন গ্রাহক পাবেন না। আপনি ব্যাংক থেকে কোন প্রকার লোন ও নিতে পারবেন না। বন্টননামা দলিল থাকলে আপনি আপনার যতটুকু জমি তার সীমানা নির্ধারণ করতে পারবেন। আপনার যদি বন্টননামার দলিল না থাকে তাহলে আপনার ভাই বোনেরা আপনার সেই অংশ দখল করে নিতে পারবে খুব সহজেই।আপনার যদি বন্টননামা দলিল না থাকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানেরা সেই জমি নিয়ে বড় ধরনের ঝুকিতে পরবে। অতএব যাদের যৌথ সম্পত্তি আছে তাদের জন্য সময় মত বন্টননামা করা অত্যন্ত জরুরী।

বণ্টননামা দলিলের প্রকারভেদ 

কারণ পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে জমি বন্টনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের দলিল দেখা যায়। তবে প্রধানত বন্টননামা দলিলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

.১ আপোষ বন্টননামা ;যখন কোন জমির উত্তরাধিকার বাঁ অংশিদারগন  তাদের জমির ভাগের বিষয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে একমত হয়ে দলিল করে তাকে আপোষনামা দলিল বলে । এই পদ্ধতিতে সকল অংশীদাররা মিলে কে কোন অংশ কতটুকু পাবেন দলিল লিখে আর সবাই তাতে স্বাক্ষর করে সাব রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়।এই পদ্ধতি সবচেয়ে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি । এতে সবার সাথে সম্পর্ক ভালো থাকে। খরচাও কম হয়, তবে মনে রাখতে হবে এই দলিলে একজনেরও যদি স্বাক্ষর না থাকে তবে এই দলিল করা সম্ভব না ।

২আদালতের মাধ্যমে বন্টন বা বন্টন মামলা

যখন অংশীদারদের মধ্য জমি ভাগ নিয়ে মতো বিরোধ তৈরি হয় কেউ অংশ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেনা তখন আইনের আশ্রয় নিতে হয় একই বলা হয় বন্টন মামলা ।

যদি কোনো উত্তরাধিকারগন মনে করেন তিনি তার প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তবে তিনি দেওয়ানী আদালতে বন্টন মামলা করতে পারবেন । আদালতে তখন সকল তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন হলে কমিশনার নিয়োগ করে জমি মেপে হিসাব অনুযায়ী ভাগ করে দেন । রায় হওয়ার পর আদালত যে আদেশ দেন তাকে ডিক্রি বলে । এই ডিক্রি হলো বন্টননামা দলিল হিসেবে কাজ করে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া ।মামলা শেষ হতে হতে অনেক সময় কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে আর এতে আইনি খরচাও বেশি হয়  ।

পয়েন্ট টু বি নোট ,

১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী বন্টনামা দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি হতে হবে । ২০০৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ মৌখিক বন্টন বা সাদা কাগজ করা বন্টনের কোন আইনি ভিত্তি নেই ।নামজারী করতে গেলেও রেজিস্ট্রিন বন্টননামা বাধ্যতামূলক ।

বন্টননামা দলিল করার সঠিক পদ্ধতি 

অনেকে মনে করে স্ট্যাম্পে সই করলেই বন্টননামা দলিল  হয়ে যায়,কিন্ত এটা একেবারেই ভুল ধারণা। মনে রাখবেন, বন্টননামা দলিল করতে হলে প্রথমে সকল শরিক মিলে কে কতটুকু অংশ পাবে তা চিহ্নিত করে সবাই মিলে একটি নকশা বা ম্যাপ তৈরি করে নিতে হবে।তারপর একজন দক্ষ দলিল লেখকের মাধ্যমে বাটোয়ারা দলিল তৈরি করতে হবে ।এখানে প্রত্যেকের হিস্যা ও সীমানা নির্ধারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রাখতে হবে এবং দলিলের প্রতিটি পাতায় সকল অংশিদারের সাক্ষর থাকা বাধ্যতামুলক। 

 স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে  গিয়ে দলিলটি রেজিস্ট্রি করতে হবে। রেজিস্ট্রি ছাড়া বন্টননামা দলিলের কোনো আইনি ভিত্বি নেই ।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা

বন্টননামা দলিল করার জন্য নিচের প্রয়োজনীয় কাগজ গুলো অবশ্যই গুছিয়ে রাখতে হবে। মালিকানা দলিলের মূল দলিল বা সার্টিফাইড কপি,খতিয়ান বা পর্চা্‌ সি এস,এস এ, আর এস এবং বিএস বা সিটি জরিপ। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরের ইশ্যুকৃত  উত্তরাধিকার সনদ।সকল অংশিদাড়ের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি, জমির খাজনা পরিশোধের রশিদ। 

বন্টননামা দলিল রেজিস্ট্রেশন খরচ ২০২৬

জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ সাধারণত জমির মূল্যের উপর নির্ভর করে না। এটি  সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কমবেশি হতে পারে, সেই হিসাবে নির্ধারিত করতে হয়। বণ্টননামা দলিলের জন্য প্রতিজন অংশীদারের নির্দিষ্ট হারে একটি ফি নির্ধারণ করা থাকে। প্রতিটি দলিলের জন্য নির্দিষ্ট মূলের স্ট্যাম্প ব্যবহার করতে হয়।  বন্টননামা দলিল করার জন্য ই-ফি ও এনফি  শোধ করতে হয়। 

ই-ফি হলো মূলত অনলাইন্ ডাটা এন্ট্রি ফি ।এটি  দলিল সাব রেজিস্ট্রি অফিসে অবেদন করার সময়  পরিশোধ করতে হয় ,এই ফি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অংকের হয়ে থাকে[১০০-২০০ টাকা] এই পরিমাণ।

এন-ফি সাধারণত কেস বাঁ নগদ টাকায় পেমেন্ট করতে হয় ।সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের হুবহু কপি রেখে দেওয়া হয় , তাকে বলে নকল নবিশ । এই নকল নবিশ তৈরীর জন্য সরকারকে যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় তাকেই বলা হয় এনফি। এনফি প্রতি ৩০০ শব্দের জন্য একটি নির্দিষ্ট হারে[বর্তমানে ১৬-২৪ টাকা পর্যন্ত হতে পারে] দিতে হয়।

 নামজারী বা  মিউটেশন

অনেকেই মনে করেন বন্টননামা দলিল করলেই কাজ শেষ কিন্তু তা ভুল। বন্টননামা দলিলের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল মিউটেশন বা নামজারি।

দলিল হাতে পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলোএসিলেন্ট অফিসে আবেদন করে নিজের নামে আলাদা খতিয়ান খুলে নেওয়া।  নামজারি বা মিউটেশন না করলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রয় বা ব্যাংক লোন নিতে জটিলতা তৈরি হবে। তাই অবশ্যই অবশ্যই নামজারি বা মিউটেশন করে নিতে হবে।

বন্টনামা ও নামজারীর পার্থক্য

পার্থক্যের বিষয় বন্টননামা নামজারি
মূল উদ্দেশ্য যৌথমালিকানাধীন জমি শরিকদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্টন করা সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা।
সম্পাদনের স্থান জেলা বাঁ থানা সাব রেজিস্ট্রি অফিস উপজেলা ভূমি অফিসে
প্রমাণপ্ত্র এইনপ্রক্রিয়ায় একটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিল পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় একটি খতিয়ান বাঁ পর্চা পাওয়া যায়।
কারা করেন জমির সকল অংশীদার রা মিলে এতি করেন। জমির মালিক একক ভাবে নিজের অংশের জন্য এটি করেন।
খাজনা প্রদান এর মাধ্যমে সরাসরি আলাদাভাবে খাজনা দেওয়া যায় না। এর মাধ্যমেই জমির খাজনা দেওয়ার অধিকার পাওয়া যায়।
কখন প্রয়োজন যখন যৌথ সম্পত্তি নিজের নামে আলাদা করার প্রয়োজন হয়। দলিল পাওয়ার পর যখন সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম তোলা প্রয়োজন হয়।

বন্টন নামা নিয়ে সাধারণ কিছু ভুল ধারণা ও সমাধান।

বন্টননামা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করে মৌখিক ভাগই যথেষ্ট রেজিস্ট্রি করার দরকার নেই, কিন্তু আইনত মৌখিক ভাগের কোন দাম নেই।বন্টননামা  দলিল ছাড়া আপনি আপনার জমির অংশের পূর্ণ মালিক হতে পারবেন না।

যদি কোন একজন অংশিদার রাজি না হয় বন্টন দলিল করতে তাহলে দলিল হবে না। তবে বাস্তবে এটারও সমাধান আছে, এক্ষেত্রে আপনাকে আদালতের মাধ্যমে বন্টননামা মামলা করতে হবে মামলার নিষ্পত্তিতে আপনি বন্টননামা দলিল করতে পারবেন। 

আবার অনেকে মনে করেন পৈত্রিক জমি ভাগ করতে  দলিল লাগেনা কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিও আইনত বন্টননামা দলিল করে হয় ভাগ করতে হয়। 


উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, জমি কেবল একটি স্থাবর সম্পত্তি নয় অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের মর্যাদা আবেগের সাথে জড়িত। পৈতৃক বা যৌথ মালিকানাধীন জমির ভাগ বাটোয়ারা  নিয়ে ভাই বোন ও আত্মীয়দের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ভাই বোন আত্মীয়স্বজনের মাঝে দুরত্ব  তৈরি হোক এটা কারো কাম্য নয়।এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়ানোর জন্য শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার হল সঠিক নিয়মে বন্টননামা দলিল প্রক্রিয়া।

অনেকেই আছে খরচ বা সময়ের অভাবে দলিল করতে দেরি করেন। ভবিষ্যতের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। মনে রাখবেন আজকের সামান্য অবহেলা আপনার  সন্তানদের জন্য পাহাড়সমান বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য সঠিক নিয়মে আইনের প্রক্রিয়ায় দলিল করে সেই মোতাবেক নামজারি করুন।

আমার লেখাটি যদিবভালো লাগে কমেন্ট করে মতামত দিন।আর যদি কিছু প্রশ্ন থাকে তাহলে কমেন্টে প্রশ্ন করুন আমার পক্ষে যতটুক সম্ভব উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব আর আমার লেখাটি শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।  

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

bosontobouryনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Tania Akter
Tania Akter
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অর্ডিনারি আইটির শিক্ষার্থী। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ২ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।